আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ক্রিকেটারদের চোটের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই বিসিসিআইয়ের, বড় তথ্য ফাঁসের পর তোলপাড়
আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির সামনে অসহায় বিসিসিআই? খেলোয়াড়দের চোট ও ওয়ার্কলোড নিয়ে বড় বিতর্ক
আইপিএলের জমকালো মঞ্চে ক্রিকেটারদের ওয়ার্কলোড (কাজের চাপ) এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর পক্ষ থেকে খেলার জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির বিষয়টি আবারও ক্রিকেট বিশ্বে একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) দলের তারকা স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী তাঁর বাঁ পায়ে হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার (সামান্য ফাটল) থাকা সত্ত্বেও ম্যাচ খেলেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই খবর সামনে আসার পরই খেলোয়াড়দের চোটের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে অবশেষে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)।
১৬ মে-র ম্যাচে কী ঘটেছিল?
গত ১৬ মে গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) একটি ম্যাচ চলাকালীন এই চোটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে সামনে আসে। ম্যাচ চলাকালীন দেখা যায় যে, বরুণ চক্রবর্তী তীব্র ব্যথায় ভুগছেন এবং শারীরিকভাবে বেশ অস্বস্তিতে রয়েছেন। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর কোটার সম্পূর্ণ ৪ ওভারের বোলিং স্পেল শেষ করেন। মাঠের ভেতরে এবং বাইরে যাওয়ার সময় এই ভারতীয় তারকা স্পিনারকে স্পষ্টতই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে দেখা যায়। নিজের বোলিং মার্কে ফিরে যাওয়ার সময়ও তাঁর শরীরী ভাষায় চরম অস্বস্তি প্রকাশ পাচ্ছিল। এই ঘটনা দেখার পর ক্রিকেটপ্রেমী এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ওঠে, এত বড় চোট নিয়ে কেন একজন জাতীয় স্তরের ক্রিকেটারকে মাঠে নামানো হলো?
খেলোয়াড়দের ফিটনেস নিয়ে বিসিসিআইয়ের অসহায়ত্ব প্রকাশ
এই গুরুতর পরিস্থিতিতে বিসিসিআইয়ের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা অবশেষে নীরবতা ভেঙেছেন। বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সামনে বোর্ডের এক প্রকার অসহায়তা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, আইপিএল চলাকালীন ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো ক্রিকেটারদের ফিটনেস ও খেলা সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপর বিসিসিআইয়ের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই।
আগামী মাসে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ঘরোয়া সিরিজের দল ঘোষণার পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে দেবজিৎ সাইকিয়া বলেন, ‘যতদূর আইপিএলের বিষয়, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো নিজেরাই খেলোয়াড়দের চোট এবং ফিটনেসের যত্ন নেয়। অবশ্য, আমাদের সেন্টার অব এক্সেলেন্স (সিওই)-এর ফিজিওথেরাপিস্টরাও তাঁদের ওপর নজর রাখছেন। ক্রিকেটারদের ওয়ার্কলোড কেমন হওয়া উচিত এবং কীভাবে তাঁদের ফিট রাখা যায়, সেই বিষয়ে গাইডলাইন ও পরিকল্পনা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, আমাদের নজরদারি অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু আইপিএল যখন চলে, তখন আমরা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে খুব বেশি হস্তক্ষেপ করতে পারি না।’
বিসিসিআই সচিব আরও ব্যাখ্যা করে বলেন যে, বিষয়টি যদি সরাসরিভারতীয় জাতীয় দলের হতো, তবে বোর্ডের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি থাকত। তিনি যোগ করেন, ‘পরিস্থিতি যদি ভারতীয় দলের হতো, তবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি থাকত। কিন্তু এখন, আমরা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে সেই স্বাধীনতা দিয়েছি যাতে তারা তাদের খেলোয়াড়দের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে হ্যাঁ, যখন জাতীয় দল নির্বাচনের সময় আসে, তখন আমরা নিশ্চিতভাবেই তাদের ফিটনেস লেভেল খুঁটিয়ে পরীক্ষা করি।’
মেডিকেল স্টাফদের ওপর আস্থা রাখছেন প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর
এই বিতর্কিত পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় দলের প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকরও নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, একজন খেলোয়াড় নিজেই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারেন যে চোট বা শারীরিক অস্বস্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি খেলতে পারবেন কি না। তবে নির্বাচক হিসেবে তাঁরা সম্পূর্ণভাবে ট্রেনার এবং ফিজিওথেরাপিস্টদের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেন বলে তিনি স্বীকার করেন।
প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর বলেন, ‘কখনও কখনও একজন খেলোয়াড় নিজেই জানেন যে তিনি সামান্য চোট বা অস্বস্তি নিয়ে খেলতে পারবেন কি না। এখানে বসে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে তারা চোট বা নিগলস (সামান্য ব্যথা) নিয়ে খেলছেন কি না। অবশ্যই, যখন তারা জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন, তখন আমরা তাদের সম্পূর্ণ ফিট দেখতে চাই। কিন্তু এটি আসলে ট্রেনার এবং ফিজিওথেরাপিস্টদের দক্ষতার জায়গা। তারাই আমাদের নিয়মিত ফিডব্যাক দেন যে একজন খেলোয়াড় ঠিক কোন অবস্থায় রয়েছেন।’
আগরকর আরও যোগ করেন, ‘আমি এই বিষয়ে কোনো বিশেষজ্ঞ নই। মেডিকেল টিম যদি আমাকে বলে যে একজন খেলোয়াড় সম্পূর্ণ ফিট, তবে দল নির্বাচনের সময় আমাকে তাদের রিপোর্টের ওপরই বিশ্বাস রাখতে হবে। হতে পারে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আমাদের জানানো হলো যে নির্দিষ্ট দুই খেলোয়াড় (রোহিত শর্মা এবং হার্দিক পান্ডিয়া) ফিটনেস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি, তখন আমরা সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব। তবে এই মুহূর্তে আমাকে জানানো হয়েছে যে তারা সঠিক পথেই আছেন এবং আমরা তাদের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করব। তারা আইপিএলে চোট নিয়ে খেলছিলেন কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। ভারতীয় ফিজিও আমাকে যা বলেন, আমি কেবল সেটাই মেনে চলি এবং ভারতীয় ফিজিওর ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
ভারতীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে আরও চোটের উদ্বেগ
বর্তমানে শুধুমাত্র বরুণ চক্রবর্তীই চোটের সমস্যায় ভুগছেন এমন নয়, ভারতীয় শিবিরে আরও বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে নিয়ে ফিটনেস উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরুণ চক্রবর্তী পায়ের আঙুলে ফ্র্যাকচার (চিড়) থাকা সত্ত্বেও আইপিএলে বোলিং চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, বাঁহাতি ফাস্ট বোলার আর্শদীপ সিংও একটি ছোটখাটো চোটের মুখোমুখি হয়েছেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যদিও এই বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
একই সঙ্গে, ভারতীয় দলের দুই সিনিয়র ক্রিকেটার রোহিত শর্মা এবং হার্দিক পান্ডিয়াকে আগামী আফগানিস্তান সিরিজের স্কোয়াডে রাখা হলেও, সিরিজে তাদের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে বিসিসিআইয়ের কাছ থেকে চূড়ান্ত ফিটনেস ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র পাওয়ার ওপর। এর ফলে, আইপিএলে খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত ম্যাচ খেলার ধকল কীভাবে জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে ক্রিকেট মহলে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং জাতীয় দলের স্বার্থের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে বিসিসিআই কীভাবে সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
