রবীন্দ্র জাদেজা মাঠে বসেই ক্লাস নিলেন যশস্বী জয়সওয়ালের! RR বনাম LSG ম্যাচে ভাইরাল মুহূর্ত
ম্যাচের উত্তেজনার মাঝে জাদেজা-জয়সওয়াল দ্বৈরথ?
আইপিএল ২০২৬-এর ৬৪তম ম্যাচে লখনউ সুপার জায়ান্টসের (LSG) বিরুদ্ধে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জয় তুলে নিয়েছে রাজস্থান রয়্যালস (RR)। এই জয়ের ফলে প্লে-অফের দৌড়ে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে তারা। তবে এই ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল মাঠের ভেতরে নয়, বরং মাঠের সীমানায়। রিয়ান পরাগ এবং রবীন্দ্র জাদেজার মতো দুই তারকা খেলোয়াড় একাদশে না থাকা সত্ত্বেও যশস্বী জয়সওয়ালের নেতৃত্বে মাঠে নেমেছিল রাজস্থান। তবে ম্যাচ চলাকালীন অভিজ্ঞ রবীন্দ্র জাদেজাকে তরুণ জয়সওয়ালের ক্লাস নিতে দেখা যায়, যা ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর থেকেই ক্রিকেট মহলে শোরগোল পড়ে গেছে।
সাধারণত ডাগআউটে বসে থাকা ক্রিকেটাররা মাঠের কৌশলে সরাসরি অংশ নেন না। কিন্তু রাজস্থান রয়্যালসের ক্ষেত্রে দেখা গেল এক ভিন্ন ছবি। জাদেজা নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি যখন দল কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অধিনায়ক হিসেবে যশস্বী জয়সওয়াল যখন চাপের মুখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন অভিজ্ঞ জাদেজা।
ঠিক কী ঘটেছিল মাঠের মাঝে?
ঘটনাটি ঘটে লখনউ সুপার জায়ান্টসের ইনিংসের দ্বাদশ ওভারে, যখন ক্রিজে ছিলেন মিচেল মার্শ এবং নিকোলাস পুরান। টসে জিতে প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস। কিন্তু তাদের শুরুটা একেবারেই ভালো হয়নি। লখনউয়ের দুই ওপেনার মিচেল মার্শ এবং জশ ইংলিশ মাত্র ৮.১ ওভারে ১০৯ রান তুলে রাজস্থান বোলারদের ওপর চড়াও হন। যশব পুঞ্জা এসে জশ ইংলিশকে আউট করে প্রথম ধাক্কা দিলেও, লখনউয়ের রানের গতি কমেনি। এরপর ক্রিজে আসা নিকোলাস পুরানকে সাথে নিয়ে মার্শ দ্রুত ৪২ রানের পার্টনারশিপ গড়ে তোলেন।
লখনউয়ের এই বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের সামনে রাজস্থান যখন ক্রমশ ব্যাকফুটে চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তরুণ অধিনায়ক যশস্বী জয়সওয়াল বোলিং আক্রমণে আনেন অনভিজ্ঞ পেসার সুশান্ত মিশ্রকে। এই সময় জয়সওয়াল যখন বাউন্ডারি লাইনের কাছে ফিল্ডিং করছিলেন, তখন রবীন্দ্র জাদেজা ডাগআউট থেকে ছুটে আসেন এবং তাঁর সাথে বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর আলোচনা করেন। জাদেজার চোখে-মুখে ছিল তীব্র উদ্বেগ এবং তিনি হাত নেড়ে জয়সওয়ালকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। জয়সওয়ালও অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে প্রবীণ এই অলরাউন্ডারের কথা শুনছিলেন।
অভিজ্ঞতার পাঠ দিলেন ‘স্যার’ জাদেজা
যদিও জাদেজা ও জয়সওয়ালের মধ্যে ঠিক কী কথা হয়েছিল তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি, তবে জাদেজার অঙ্গভঙ্গি দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি তরুণ অধিনায়ককে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশল বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। মহেন্দ্র সিং ধোনির অধীনে চেন্নাই সুপার কিংসে দীর্ঘদিন খেলেছেন জাদেজা। ফলে কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং কোন বোলারকে কখন ব্যবহার করতে হয়, তা তাঁর চেয়ে ভালো খুব কম ক্রিকেটারই জানেন।
আইপিএল-এর মতো বড় মঞ্চে রাজস্থান রয়্যালসের অধিনায়ক হিসেবে জয়সওয়ালের অভিজ্ঞতা একেবারেই কম। চাপের মুখে তরুণদের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বাভাবিক। তাই দল যখন ম্যাচ থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল, তখন দলের অন্যতম সিনিয়র সদস্য হিসেবে জাদেজা মাঠের বাইরে থেকেও নিজের দায়িত্ব এড়াতে পারেননি। তিনি মাঠের পাশে এসে জয়সওয়ালকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন, যা রাজস্থান শিবিরের একতার একটি সুন্দর উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
বল হাতে জাদেজার অভাব অনুভব করল রাজস্থান
এই ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসের বোলিং বিভাগ বেশ সাধারণ মানের পারফর্ম করেছে। দলের তারকা পেসার জোফ্রা আর্চার একটি উইকেট পেলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিলেন। অন্যদিকে সন্দীপ শর্মা, সুশান্ত মিশ্র এবং ব্রিজেশ শর্মা কোনো উইকেট পাননি এবং তাঁদের ইকোনমি রেট ছিল ১২-এর ওপরে। রাজস্থানের বোলারদের এই দিশেহারা বোলিং দেখে ক্রিকেট ভক্তরা রবীন্দ্র জাদেজার অভাব তীব্রভাবে অনুভব করেছেন। জাদেজা তাঁর নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেন্থ এবং নিখুঁত স্পিনের জন্য পরিচিত, যা মাঝের ওভারগুলোতে বিপক্ষ দলের রানের গতি টেনে ধরতে দারুণ কার্যকরী প্রমাণিত হতো। জাদেজা খেললে হয়তো লখনউকে আরও কম রানে আটকে রাখা সম্ভব হতো।
বৈভব সূর্যবংশীর তাণ্ডব ও রাজস্থানের জয়
তবে বোলিংয়ের ব্যর্থতা রাজস্থানকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিতে পারেনি, কারণ তাদের ব্যাটিং লাইনআপ ছিল ফর্মে। বিশেষ করে বৈভব সূর্যবংশীর বিধ্বংসী ব্যাটিং দলের জয় সহজ করে তোলে। মাত্র ৩৮ বলে ৯৩ রানের একটি অতিমানবীয় ইনিংস খেলে রাজস্থানকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন বৈভব। তাঁর এই ইনিংসে ছিল বাউন্ডারি ও ওভারবাউন্ডারির বন্যা, যা লখনউয়ের বোলারদের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এই দুর্দান্ত জয়ের ফলে রাজস্থানের প্লে-অফের আশা এখনও সগর্বে টিকে রইল।
প্লে-অফের সমীকরণ: পরবর্তী ম্যাচ ডু-অর-ডাই
লখনউয়ের বিরুদ্ধে জয় পেলেও রাজস্থান রয়্যালসের প্লে-অফ এখনও শতভাগ নিশ্চিত হয়নি। তারা বর্তমানে পয়েন্ট টেবিলের চতুর্থ স্থানে থাকলেও তাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে অন্য দলগুলো। রাজস্থান রয়্যালস এখন একটি করো-অথবা-মরো পরিস্থিতির মুখোমুখি। প্লে-অফের টিকিট নিশ্চিত করতে হলে তাদের পরবর্তী ম্যাচে শক্তিশালী মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সকে পরাজিত করতেই হবে। চেন্নাই সুপার কিংস, পাঞ্জাব কিংস এবং দিল্লি ক্যাপিটালসও প্লে-অফের দৌড়ে রয়েছে, তাই মুম্বাইয়ের বিরুদ্ধে এই ম্যাচে জয় ছাড়া রাজস্থানের সামনে আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই।
এখন দেখার বিষয়, মুম্বাইয়ের বিরুদ্ধে এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে রবীন্দ্র জাদেজা ও রিয়ান পরাগ দলে ফিরতে পারেন কিনা। একই সাথে জাদেজার দেওয়া মূল্যবান পরামর্শগুলো মাথায় রেখে যশস্বী জয়সওয়াল তাঁর অধিনায়কত্বে আরও কতটা পরিপক্কতা আনতে পারেন, সেটাই হবে দেখার বিষয়।
