মনীশ পান্ডে যেন অবিকল বিরাট কোহলি: প্রশংসায় পঞ্চমুখ হরভজন সিং
চাপের মুখে জ্বলে উঠলেন মনীশ পান্ডে: কেকেআরের অবিশ্বাস্য জয়
আইপিএল ২০২৬ (IPL 2026) আসরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের মুখোমুখি হয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR)। ইডেন গার্ডেন্সে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি কলকাতার জন্য ছিল এক প্রকার বাঁচা-মরার লড়াই। প্লে-অফের দৌড়ে টিকে থাকতে হলে কেকেআরকে এই ম্যাচে যেকোনো মূল্যে জয়লাভ করতেই হতো। এমন এক চরম উত্তেজনাকর এবং চাপের পরিস্থিতিতে দলের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন অভিজ্ঞ ব্যাটার মনীশ পান্ডে। যখন কেকেআরের টপ-অর্ডার ধসে পড়েছিল, ঠিক তখনই উইকেটে এসে দলের হাল ধরেন তিনি এবং দলকে এনে দেন এক স্মরণীয় জয়।
মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের দেওয়া ১৪৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে কলকাতার শুরুটা মোটেও ভালো ছিল না। মাত্র ৫৪ রান তুলতে তারা হারিয়ে ফেলেছিল ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। ইডেন গার্ডেন্সে তখন হারের শঙ্কা উঁকি দিচ্ছিল। এমন সময় ক্রিজে আসেন অভিজ্ঞ মনীশ পান্ডে। তিনি ৩৩ বলে ৪৫ রানের একটি অত্যন্ত সংযত এবং দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন। তাঁর এই ইনিংসে ছিল ৬টি দৃষ্টিনন্দন চারের মার, যা স্টেডিয়ামে উপস্থিত কলকাতার দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করে তোলে।
উইকেটের এক প্রান্ত আগলে রেখে মনীশ পান্ডে রভম্যান পাওয়েলের সাথে গড়ে তোলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৬৪ রানের একটি পার্টনারশিপ। এই জুটির কল্যাণে কেকেআর কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই ৪ উইকেটের জয় তুলে নিতে সক্ষম হয়। চাপের মুখে এমন এক অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার স্বীকৃতিস্বরূপ মনীশ পান্ডেকে ম্যাচ সেরার (Player of the Match) পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
বিরাট কোহলির সঙ্গে মনীশের তুলনা কেন টানলেন হরভজন সিং?
মনীশ পান্ডের এই দুর্দান্ত ইনিংসের পর ক্রিকেট মহলে তাঁর প্রশংসা এখন সবার মুখে মুখে। বিশেষ করে ভারতের সাবেক কিংবদন্তি স্পিনার হরভজন সিং মনীশের এই লড়াকু মানসিকতা এবং ফিটনেসের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি মনীশ পান্ডের মনোভাব ও খেলার প্রতি নিবেদনের তুলনা টেনেছেন আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি বিরাট কোহলির সঙ্গে।
হরভজন সিং মনে করিয়ে দেন যে, মনীশ এবং বিরাট কোহলি একই সময়ের খেলোয়াড়। ২০০৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে তারা একই দলের হয়ে খেলেছিলেন এবং বিশ্বজয় করেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে ক্রিকেটের মূল ধারায় নিজেকে টিকিয়ে রাখার পেছনে মনীশের ফিটনেস এবং মানসিক দায়িত্বশীলতার অবদান অপরিসীম বলে উল্লেখ করেন হরভজন।
স্টার স্পোর্টসের একটি অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় হরভজন সিং বলেন, “তার (মনীশ পান্ডে) সম্পৃক্ততা এবং নিবেদন হুবহু বিরাট কোহলির মতোই। কারণ সে মূলত একই গ্রুপের অংশ। আপনি এটিকে একটি ব্যাচ বা একটি দল বলতে পারেন, কথা একই। সে ঠিক সেই ব্যাচ থেকেই উঠে এসেছে এবং বিরাটের মতোই সমানভাবে ফিট। তাকে এভাবে মাঠ কাঁপাতে দেখাটা সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি। সে অত্যন্ত চমৎকার একটি ইনিংস খেলেছে। তাকে আবারও মাঠে ফিরে এভাবে ম্যাচ জেতাতে দেখে খুব ভালো লাগছে। মনীশ পান্ডে সেই সময় থেকে খেলছেন যখন আমরা খেলতাম, হয়তো তারও আগে থেকে। তবে তার এই প্রত্যাবর্তন দেখাটা সত্যিই আনন্দের।”
তরুণদের চোটের দিনে কেকেআরের ত্রাতা অভিজ্ঞ মনীশ
কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে এই মৌসুমে দারুণ ফর্মে থাকা তরুণ ব্যাটার অঙ্গকৃষ রঘুবংশী আঙুলের চোটের কারণে এই ম্যাচে খেলতে পারেননি। তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের ব্যাটিং লাইনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণের বড় দায়িত্ব ছিল অভিজ্ঞ মনীশ পান্ডের কাঁধে। হরভজন সিং প্রশংসা করে বলেন যে, দলে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়া সত্ত্বেও মনীশ কখনো নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি।
হরভজন আরও যোগ করেন, “সে নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস কখনো চলে যেতে দেয়নি। একজন অত্যন্ত সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে দলে যোগ দেওয়ার পর তাকে বেশ কিছু ম্যাচে সাইডলাইনে বসে থাকতে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে পুরো দলকে আশ্বস্ত করেছে এবং আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে যে এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি আছে। এটি সত্যিই একটি অসাধারণ ইনিংস ছিল। দলের প্রধান এবং ফর্মে থাকা ব্যাটার রঘুবংশীকে আঙুলের চোটের কারণে আজ মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছিল এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ওপর এবং সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিজের কাজ সম্পন্ন করেছে। আমি তার এই সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত।”
বিরাট কোহলি ও মনীশ পান্ডে: আইপিএলের দীর্ঘ পথচলা
বিরাট কোহলির মতোই মনীশ পান্ডেও ২০০৮ সালের উদ্বোধনী মৌসুম থেকেই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (IPL) সাথে যুক্ত রয়েছেন। আইপিএলের ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় হিসেবে সেঞ্চুরি করার অনন্য কীর্তিও রয়েছে মনীশের দখলে। তবে বিরাট কোহলি যেভাবে নিজেকে বিশ্ব ক্রিকেটের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, মনীশ পান্ডে তাঁর ক্যারিয়ারে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেননি। ফর্মের ওঠানামা এবং দলে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়ার কারণে তাঁর ক্যারিয়ার গ্রাফ কোহলির মতো আকাশচুম্বী হয়নি। তবে মুম্বাইয়ের বিপক্ষে এই ইনিংসটি প্রমাণ করে যে, সুযোগ পেলে এখনও যেকোনো পরিস্থিতি থেকে দলকে জেতানোর ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।
প্লে-অফের সমীকরণ: এখনও টিকে আছে কেকেআর
আইপিএল ২০২৬ মৌসুমে কেকেআরের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত হতাশাজনকভাবে। টুর্নামেন্টের প্রথম পাঁচটি ম্যাচেই টানা পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাদের। অনেকেই কেকেআরকে প্লে-অফের দৌড় থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন। তবে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে এই গুরুত্বপূর্ণ জয়টি কলকাতার জন্য বড় ধরণের বুস্টার ডোজ হিসেবে কাজ করছে, যা তাদের প্লে-অফের স্বপ্নকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে।
এই রোমাঞ্চকর জয়ের পর কেকেআর পয়েন্ট টেবিলের ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে। বর্তমানে ১৩টি ম্যাচ খেলে তাদের সংগ্রহ ১৩ পয়েন্ট। প্লে-অফে যাওয়ার আশা বাঁচিয়ে রাখতে হলে কেকেআরকে তাদের পরবর্তী ও শেষ ম্যাচে আগামী ২৪ মে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেন্সে দিল্লি ক্যাপিটালসের (DC) বিরুদ্ধে মাঠে নামতে হবে। এই ম্যাচে জয় পেলে কলকাতার সর্বোচ্চ পয়েন্ট হবে ১৫।
তবে কেবল নিজেদের শেষ ম্যাচে জয়লাভ করলেই কেকেআরের প্লে-অফ নিশ্চিত হবে না। কেকেআরকে একই সাথে প্রার্থনা করতে হবে যেন পাঞ্জাব কিংস (PBKS) এবং চেন্নাই সুপার কিংস (CSK) তাদের নিজ নিজ ম্যাচগুলোতে পরাজিত হয়। কারণ শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলের লড়াইয়ে নেট রান রেট (NRR) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সমীকরণের এই জটিল জট পেরিয়ে নাইটরা প্লে-অফে জায়গা করে নিতে পারে কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
