Latest Cricket News

ভারতীয় দলে উপেক্ষার জবাব: আইপিএলে নতুন ইতিহাস গড়লেন মোহাম্মদ শামি

Hassan Raza · · 1 min read
Share

উপেক্ষার মোক্ষম জবাব: আইপিএলে মোহাম্মদ শামির ঐতিহাসিক কীর্তি

ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পেসার মোহাম্মদ শামি আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাকে বিশ্বমানের বোলার বলা হয়। সম্প্রতি ভারতীয় জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর অনেকেই হয়তো তার ক্যারিয়ার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে শামি মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই সমস্ত সমালোচনার জবাব দিতে ভালোবাসেন। ২০২৬ সালের আইপিএল মরশুমে পাঞ্জাব কিংসের ওপেনার প্রিয়াংশ আর্যকে তার স্পেলের প্রথম বলেই আউট করে আইপিএল ইতিহাসের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন এই ডানহাতি ফাস্ট বোলার। এটি কেবল একটি উইকেট ছিল না, এটি ছিল তার ফিরে আসার এক জোরালো বার্তা।

লখনউ সুপার জায়ান্টস এবং শামির নতুন পথচলা

আইপিএল ২০২৬ মরশুমটি লখনউ সুপার জায়ান্টসের (LSG) জন্য খুব একটা ভালো ছিল না। ১৪টি ম্যাচ শেষে মাত্র ৮ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের তলানির দিকে থেকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে সঞ্জীব গোয়েঙ্কার দলকে। তবে দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স হতাশাজনক হলেও, বিশেষ করে মরশুমের শুরুতে লখনউয়ের বোলিং বিভাগ বেশ নজর কেড়েছিল। আর এই বোলিং আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিলেন মোহাম্মদ শামি। ২০২৫ সালের মরশুমে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের (SRH) হয়ে একটি অত্যন্ত বাজে মরশুম কাটানোর পর, ট্রেডিং উইন্ডোর মাধ্যমে শামিকে দলে ভেড়ায় লখনউ সুপার জায়ান্টস। দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরা শামির জন্য এই মরশুমটি ছিল নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে প্রথম বলেই বাজিমাত এবং ঐতিহাসিক রেকর্ড

পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে লখনউ সুপার জায়ান্টসের শেষ ম্যাচে অধিনায়ক ঋষভ পন্তের অন্যতম বিশ্বস্ত নতুন বলের বোলার হিসেবে বোলিং শুরু করেন মোহাম্মদ শামি। নতুন বলে উইকেট নেওয়া শামির একটি সহজাত প্রবৃত্তি। ম্যাচের প্রথম ওভারেই তার হাতে বল তুলে দেওয়া হয় এবং স্ট্রাইকে থাকা বিপজ্জনক ওপেনার প্রিয়াংশ আর্যকে প্রথম বলেই সাজঘরে ফিরিয়ে দেন তিনি। এই উইকেটের সাথে সাথেই শামি আইপিএল ইতিহাসের এক অনন্য রেকর্ড নিজের নামে করে নেন।

চলতি ২০২৬ মরশুমে এটি ছিল ষষ্ঠবারের মতো কোনো স্পেলের প্রথম বলেই শামির উইকেট নেওয়ার ঘটনা। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল ইংল্যান্ডের জোফরা আর্চারের দখলে, যিনি এক মরশুমে স্পেলের প্রথম বলে ৫টি উইকেট নিয়েছিলেন। আর্চারের সেই রেকর্ড ভেঙে আইপিএল ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে এক মরশুমে স্পেলের প্রথম বলে ৬টি উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়লেন শামি।

স্পেলের প্রথম বলে উইকেট নেওয়ার চ্যালেঞ্জ

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে প্রথম বল থেকেই ব্যাটাররা আক্রমণাত্মক খেলার চেষ্টা করে। বিশেষ করে পাওয়ারপ্লেতে ফিল্ডিংয়ের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে রানের গতি বাড়াতে চান ওপেনারেরা। এমন পরিস্থিতিতে একজন বোলারের জন্য প্রথম বলেই উইকেট তুলে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ। এর জন্য প্রয়োজন নিখুঁত লাইন-লেন্থ, গতি এবং সুইংয়ের মেলবন্ধন। মোহাম্মদ শামি এই মরশুমে লখনউয়ের হয়ে ঠিক এই কাজটিই বারবার করেছেন। যখনই অধিনায়ক ঋষভ পন্ত তার হাতে নতুন বল তুলে দিয়েছেন, শামি প্রতিপক্ষের অন্যতম সেরা ব্যাটারকে আউট করে দলকে ব্রেক-থ্রু এনে দিয়েছেন। প্রিয়াংশ আর্যর উইকেটটি ছিল তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই অনন্য রেকর্ডের মাধ্যমে শামি প্রমাণ করেছেন যে চাপের মুখেও তিনি কতটা ঠাণ্ডা মাথায় নিজের সেরাটা দিতে পারেন।

ইনজুরি কাটিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন

মোহাম্মদ শামির এই কৃতিত্ব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তার কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগের ফসল। দীর্ঘদিন ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল এই তারকা পেসারকে। ভারতীয় জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। তবে দমে যাননি তিনি। ঘরোয়া মরশুম শুরুর ঠিক আগে পুরোপুরি ফিট হয়ে মাঠে ফেরেন শামি। বাংলার হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই (রঞ্জি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফি এবং সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি) অংশ নেন তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলার হয়ে অবিশ্বাস্য বোলিং প্রদর্শন করেন শামি। প্রতিটি টুর্নামেন্টেই তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে সফল ও প্রধান উইকেট শিকারী।

ক্রিকেট ক্যারিয়ারে চোটের কারণে বহুবার পিছিয়ে পড়তে হয়েছে শামিকে। তবে প্রতিবারই তিনি দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে এসেছেন। জাতীয় দলের ফিজিও এবং রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রম করার পর তিনি মাঠে ফেরেন। অনেকে ভেবেছিলেন বয়সের কারণে হয়তো আগের সেই ধার থাকবে না। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটে বাংলার হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে লাল বলের ক্রিকেটে হোক কিংবা বিজয় হাজারে ও সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে সাদা বলের ক্রিকেট—সব ফরম্যাটেই শামি ছিলেন সমান কার্যকরী। তার বোলিংয়ের সুইং এবং সিম পজিশন ছিল আগের মতোই নিখুঁত, যা ঘরোয়া লিগের ব্যাটারদের জন্য খেলা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

লখনউয়ের জার্সিতে উন্নত পারফরম্যান্স

ঘরোয়া ক্রিকেটের সেই দুর্দান্ত ফর্ম শামি ধরে রাখেন আইপিএলেও। লখনউ সুপার জায়ান্টসের হয়ে এই মরশুমে ১৩টি ম্যাচে অংশ নিয়ে মোট ১২টি উইকেট শিকার করেছেন তিনি। কেবল উইকেট সংখ্যাই নয়, পাওয়ারপ্লেতে বল করা সত্ত্বেও তার ইকোনমে রেট ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। ২০২৫ সালের মরশুমে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে তার যে রান দেওয়ার প্রবণতা ছিল, লখনউয়ের জার্সিতে তা চমৎকারভাবে কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। তার নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং সুইং প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের জন্য রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।

নির্বাচকদের অদ্ভুত সিদ্ধান্ত: উপেক্ষিত শামি

২০২৫-২৬ ঘরোয়া মরশুমে এবং আইপিএল ২০২৬-এ শামির এমন অসাধারণ ফিটনেস ও বোলিং পারফরম্যান্সের পরেও ভারতীয় জাতীয় দলে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়নি। অজিত আগরকরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নির্বাচক কমিটি শামির এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সকে কার্যত উপেক্ষা করেছে। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আসন্ন ওডিআই সিরিজের জন্য ঘোষিত ভারতীয় দলে শামির লখনউ সুপার জায়ান্টসের দুই সতীর্থ মহসিন খান এবং প্রিন্স যাদবকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, মহসিন খান যেখানে প্রায়শই চোটের কবলে পড়েন, সেখানে তাকে দলে নেওয়া হলেও শামির মতো একজন অভিজ্ঞ ও সম্পূর্ণ ফিট বোলারকে আবারও ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে। নির্বাচকদের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রিকেট মহলে ইতিমধ্যেই নানা গুঞ্জন ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

উপসংহার

জাতীয় দলে উপেক্ষিত হলেও মোহাম্মদ শামি মাঠের বাইরে বা ভেতরে কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। বরং বল হাতেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তার ধার এখনো কমেনি। আইপিএলে তার এই ঐতিহাসিক কীর্তি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি শামির অদম্য ইচ্ছা এবং ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসার প্রতীক। ভারতীয় নির্বাচকরা তাকে অবহেলা করলেও, ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে এবং রেকর্ডের পাতায় শামি তার নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে চলেছেন। আশা করা যায়, খুব শীঘ্রই নির্বাচকরা তাদের ভুল বুঝতে পারবেন এবং এই অভিজ্ঞ পেসারকে আবারও নীল জার্সিতে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যাবে।