ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের নতুন নির্বাচক ও টেস্ট স্কোয়াড ঘোষণা: অ্যাশেজ পরবর্তী বড় পরিবর্তন
ইংল্যান্ড ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনা: নির্বাচক হিসেবে মার্কাস নর্থের অভিষেক
ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। অ্যাশেজ সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৪-১ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ECB) তাদের দল নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং স্কোয়াড গঠনে বড় ধরনের রদবদল এনেছে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো নতুন জাতীয় নির্বাচক হিসেবে সাবেক অস্ট্রেলীয় ব্যাটার মার্কাস নর্থের নিয়োগ। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিদেশি ব্যক্তিত্বকে জাতীয় নির্বাচকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলো।
মার্কাস নর্থের নিয়োগটি কেবল অভাবনীয়ই নয়, বরং অত্যন্ত কৌশলগত। তিনি গত কয়েক বছর ধরে ডারহামের ক্রিকেট ডিরেক্টর হিসেবে সফলতার সাথে কাজ করছেন। সেখানে তিনি বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। বুধবার ইসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে তার নাম ঘোষণা করে জানায় যে, নর্থ সিনিয়র দল থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক উন্নয়ন প্রোগ্রাম পর্যন্ত সব স্তরের দল নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। লুক রাইটের তিন বছরের মেয়াদের পর নর্থের আগমন কাউন্টি ক্রিকেটের পারফরম্যান্সকে জাতীয় দলে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন আশা জাগিয়েছে।
নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য নতুন চেহারার টেস্ট স্কোয়াড
ব্রেন্ডন ম্যাককালাম এবং বেন স্টোকস জুটির অধীনে ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেট বা ‘বাজবল’ কৌশল গত অ্যাশেজে বড় ধাক্কা খেয়েছে। সেই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন তিন ম্যাচের হোম সিরিজের জন্য এক আমূল পরিবর্তিত স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ৪ জুন লর্ডসে শুরু হতে যাওয়া প্রথম টেস্টের জন্য ঘোষিত দলে বড় চমক হিসেবে বাদ পড়েছেন নিয়মিত ওপেনার জ্যাক ক্রলি এবং তিন নম্বর পজিশনের নির্ভরযোগ্য ব্যাটার ওলি পোপ। এই দুই অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া প্রমাণ করে যে, বোর্ড এখন কঠোর পারফরম্যান্স বিচার করছে।
তিনজন নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি
ঘোষিত এই স্কোয়াডে তিনজন এমন খেলোয়াড়কে ডাকা হয়েছে যাদের এখনও আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয়নি। তাদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো ২২ বছর বয়সী জেমস রিউ। গত কয়েক মৌসুম ধরে কাউন্টি ক্রিকেটে রানের পাহাড় গড়েছেন তিনি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ইতিমধ্যে ১২টি সেঞ্চুরি রয়েছে তার ঝুলিতে, যার মধ্যে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসটি ২২১ রানের। রিউ কেবল একজন দক্ষ ব্যাটারই নন, তিনি একজন দক্ষ উইকেটকিপারও। যদি জেমি স্মিথকে কেবল বিশেষজ্ঞ ব্যাটার হিসেবে খেলানো হয়, তবে গ্লাভস হাতে জেমস রিউকে দেখা যেতে পারে।
অন্যতম নতুন মুখ হলেন ওপেনার এমিলিও গে। ২৪ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার গত দুই বছর ধরে তার মায়ের জন্মভূমি ইতালির হয়ে সীমিত ওভারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন। তবে এবার ইংল্যান্ডের সাদা পোশাকে নিজেকে প্রমাণের বড় সুযোগ তার সামনে। তৃতীয় আনক্যাপড খেলোয়াড় হিসেবে স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন ২৩ বছর বয়সী তরুণ পেসার সনি বেকার।
বোলিং বিভাগে অভিজ্ঞতার সংকট ও নতুন সম্ভাবনা
ইংল্যান্ডের পেস বোলিং আক্রমণ বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কিংবদন্তি পেসার জেমস অ্যান্ডারসন এবং স্টুয়ার্ট ব্রডের অবসরের পর ক্রিস ওকসও টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছেন। এর পাশাপাশি মার্ক উড এবং ব্রাইডন কার্স ইনজুরিতে আক্রান্ত এবং জোফরা আর্চার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতির কারণে টেস্টের জন্য অনুপলব্ধ। এই পরিস্থিতিতে বোলিং বিভাগকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে ওলি রবিনসনের ওপর।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত সফরের পর থেকে দলের বাইরে থাকা ৩২ বছর বয়সী ওলি রবিনসন আবারও টেস্ট দলে ফিরেছেন। তার টেস্ট ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান অত্যন্ত উজ্জ্বল; ২২.৯২ গড়ে তিনি ৭৬টি উইকেট শিকার করেছেন। সম্প্রতি কাউন্টি ক্রিকেটে সাসেক্সের হয়ে ১০ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে সেঞ্চুরি করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, লোয়ার অর্ডারেও তিনি দলের সম্পদে পরিণত হতে পারেন। রবিনসনের পাশাপাশি ম্যাথিউ ফিশারকেও দলে ফেরানো হয়েছে, যিনি ২০২২ সালে তার একমাত্র টেস্ট ম্যাচটি খেলেছিলেন।
স্পিন বিভাগ: বশির ও রেহানের ওপর ভরসা
স্পিন আক্রমণে ইংল্যান্ড তাদের তরুণ প্রতিভাগুলোর ওপরই ভরসা রাখছে। অ্যাশেজ সিরিজে ইংল্যান্ডের এক নম্বর স্পিনার হিসেবে বিবেচিত হলেও শোয়েব বশির একটি ম্যাচও খেলার সুযোগ পাননি। তবে নিউজিল্যান্ড সিরিজে তাকে মূল স্পিনার হিসেবে দেখা যেতে পারে। তার সাথে যোগ দিয়েছেন ২১ বছর বয়সী লেগ স্পিনার রেহান আহমেদ। গত অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ টেস্ট খেলা রেহান ব্যাটিংয়েও বেশ পারদর্শী। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ছয়টি সেঞ্চুরি থাকা রেহান দলের ব্যাটিং গভীরতা বাড়াতে সাহায্য করবেন। তবে এই স্কোয়াডে জায়গা হয়নি অলরাউন্ডার উইল জ্যাকসের।
সিরিজের সময়সূচী ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই সিরিজটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নিরিখে ইংল্যান্ডের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিরিজের প্রথম টেস্ট শুরু হবে ৪ জুন বিখ্যাত লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে। দ্বিতীয় টেস্টটি অনুষ্ঠিত হবে ১৭ জুন থেকে ওভাল মাঠে এবং তৃতীয় ও শেষ টেস্টটি শুরু হবে ২৫ জুন নটিংহ্যামে। এই সিরিজের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পাকিস্তান সিরিজের দল ঘোষণা করা হবে।
নিউজিল্যান্ড সিরিজের প্রথম টেস্টের স্কোয়াড:
- বেন স্টোকস (অধিনায়ক)
- রেহান আহমেদ
- গাস অ্যাটকিনসন
- সনি বেকার
- শোয়েব বশির
- জ্যাকব বেথেল
- হ্যারি ব্রুক
- বেন ডাকেট
- ম্যাথিউ ফিশার
- এমিলিও গে
- জেমস রিউ
- ওলি রবিনসন
- জো রুট
- জেমি স্মিথ
- জশ টাং
ইংল্যান্ড ক্রিকেটের এই বিশাল পরিবর্তন ক্রিকেট ভক্তদের মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের বাদ পড়া যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে মার্কাস নর্থের মতো একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেট মস্তিষ্ককে নির্বাচক হিসেবে পাওয়া এবং তরুণ প্রতিভাদের সুযোগ দেওয়া ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
