বৈভব সূর্যবংশীর ‘অবিশ্বাস্য’ ব্যাটিংয়ে মুগ্ধ জাস্টিন ল্যাঙ্গার | আইপিএল ২০২৫
ল্যাঙ্গারের চোখে বৈভব সূর্যবংশী: এক বিস্ময়কর প্রতিভা
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১০০টিরও বেশি টেস্ট খেলা এবং দলটিকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতানো কিংবদন্তি জাস্টিন ল্যাঙ্গার ক্রিকেটের দীর্ঘ ৩৫ বছরে বহু প্রতিভার উত্থান-পতন দেখেছেন। কিন্তু মাত্র ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের ব্যাটিং দেখে তিনি যেভাবে বিস্মিত হয়েছেন, তা হয়তো আগে কখনো ঘটেনি। রাজস্থান রয়্যালসের বৈভব সূর্যবংশীর অবিশ্বাস্য ব্যাটিং তাণ্ডব ল্যাঙ্গারকে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে।
লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে ২২১ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে রাজস্থান রয়্যালসের প্রয়োজন ছিল এক অতিমানবীয় ইনিংসের। আর ঠিক তখনই জ্বলে ওঠেন বৈভব। তার মাত্র ৩৮ বলে ৯৩ রানের বিধ্বংসী ইনিংসটি রাজস্থানের জয়কে একপ্রকার সহজ করে তোলে। তিনি যখন আউট হন, তখন রাজস্থানের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল মাত্র ৩৬ বলে ৪১ রান। লখনউয়ের ডাগআউটে বসে থাকা বিপক্ষ দলের কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গারও এই ব্যাটিং দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
স্টার্ক-নর্টজেদের অসহায়তা এবং ল্যাঙ্গারের সতর্কতা
ম্যাচ শেষে ল্যাঙ্গার বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা জারি করেছেন। তিনি বলেন, “আমার ৩৫ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে আমি অনেক অসাধারণ খেলোয়াড় দেখেছি। তবে এই তরুণ যেভাবে ব্যাট করেছে, তা এক কথায় চোখ ধাঁধানো। শুধু আজকের ম্যাচেই নয়, পুরো সিরিজ জুড়ে ওর ব্যাটিং দেখার মতো ছিল।”
ল্যাঙ্গার কীভাবে এই তরুণ প্রতিভাকে মূল্যায়ন করছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিশ্বসেরা বোলারদের অভিব্যক্তির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমি কীভাবে এটা বিচার করি জানেন? গত ম্যাচে মিচেল স্টার্কের মতো সর্বকালের সেরা সাদা বলের বোলার যখন বল করছিল, তখন ওর মুখের অভিব্যক্তি দেখার মতো ছিল। এমনকি আনরিখ নর্টজের মতো বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক বোলারকে যখন সূর্যবংশী মাঠের চারদিকে পেটাচ্ছিল, তখন ওদের মুখে যেন একটাই প্রশ্ন ছিল—’হচ্ছেটা কী এখানে?'”
সাবেক এই অজি ওপেনার আরও যোগ করেন, “একজন প্রাক্তন ব্যাটার হিসেবে আমি জানি ব্যাটিং কতটা কঠিন। আমি নিজেই ভাবছিলাম, এগুলো কী হচ্ছে? আর বোলাররা তো রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। এখন ও অরেঞ্জ ক্যাপের মালিক। মাঝেমধ্যে এই ধরণের শট খেলায় অনেক ঝুঁকি থাকে, কিন্তু ও খেলার প্রতিটি ফরম্যাটে রান করে যাচ্ছে। আর দিনশেষে ক্রিকেট তো রান করারই খেলা।”
স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে তুলনা ও অভিযোজন ক্ষমতা
সূর্যবংশীর ধারাবাহিকতা এবং রান করার ক্ষুধা দেখে ল্যাঙ্গার এতটাই মুগ্ধ যে তিনি কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। ল্যাঙ্গার বলেন, “অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ব্র্যাডম্যান যদি আজকের হেলমেট বা আধুনিক সুযোগ-সুবিধার যুগে খেলতেন, তবে কি এত রান করতে পারতেন? আমি সবসময় বলি, তিনি পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতেন। সূর্যবংশীও ঠিক তেমনই একজন খেলোয়াড়। সে যেখানেই খেলুক না কেন, পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেবে। কারণ বোলাররা তাকে কোথায় বল করবে? আমি এমন কোনো জায়গা দেখি না যেখানে বল করে তাকে আটকানো সম্ভব। তাই সে প্রতিনিয়ত আরও ভালো হতে থাকবে, যা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য সত্যিই ভীতিজনক।”
অধিনায়ক রিয়ান পরাগের প্রশংসা ও বৈভবের পরিপক্কতা
বৈভবের ইনিংসটি অবশ্য শুরু থেকেই মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে মোহসিন খানের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে শুরুতে কিছুটা ভুগেছেন তিনি। এক পর্যায়ে তার রান ছিল ৫ বলে ১ এবং ১০ বলে ৫। কিন্তু সেখান থেকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে পরের ২৮ বলে তিনি করেন ৮৮ রান! যা তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।
অধিনায়ক রিয়ান পরাগ ডাগআউটে বসে বৈভবের এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো খুব কাছ থেকে দেখেছেন। পরাগ বলেন, “আমার মতে এটিই ওর সেরা ইনিংস। ও যখন ১০ বলে ৫ রানে খেলছিল, তখন ডাগআউটে বসে আমিও একই কথা ভাবছিলাম। এই পরিস্থিতি থেকে একজন ব্যাটার দুটি পথ বেছে নিতে পারে। এক, নিজের অহংকারকে সামনে এনে এলোপাথাড়ি শট খেলা শুরু করা। আর দ্বিতীয়টি হলো, মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি বুঝে খেলা।”
পরাগ আরও যোগ করেন, “মাত্র ১৫ বছর বয়সী বৈভবের খেলা দেখাটা সত্যিই আনন্দের ছিল। ও সময় নিয়েছে। কাভারের ওপর দিয়ে ওর প্রথম বড় শটটি আমাকে স্বস্তি দিয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ও বয়সে ছোট হতে পারে, কিন্তু খেলার প্রতি ওর বোঝাপড়া অনেক গভীর। অনেক সিনিয়র ব্যাটার, এমনকি আমি নিজেও অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে পারি না। কিন্তু বৈভব যা করেছে তা প্রশংসনীয়। গত দুই বছরে আমি ওর যত ইনিংস দেখেছি, তার মধ্যে এটিই সেরা।”
অরেঞ্জ ক্যাপ এবং নতুন দিগন্ত
এই বিধ্বংসী ইনিংসের পর বৈভব সূর্যবংশী চলতি আইপিএলের রান সংগ্রাহকদের তালিকায় সবার ওপরে উঠে এসেছেন এবং অরেঞ্জ ক্যাপ নিজের করে নিয়েছেন। রান করার পাশাপাশি তার স্ট্রাইক রেটও ছিল অবিশ্বাস্য। ল্যাঙ্গারের মতে, সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো বৈভব এখনো ব্যাটিংয়ের অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। ও যখন ব্যাটিংয়ের আসল ব্যাকরণগুলো পুরোপুরি আয়ত্ত করবে, তখন বোলারদের অবস্থা কী হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
